সর্বদাই সক্রিয় থাকুন:
ড. এ. পি. জে. আব্দুল কালামের জীবন থেকে শিক্ষা
জীবনে সফল হতে শুধু প্রতিভা বা জ্ঞানই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সক্রিয় থাকা, নিয়মিত কাজ করা এবং নিজের সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার করা। যে মানুষ শরীর ও মনকে নিষ্ক্রিয় হতে দেয় না, সে জীবনের সুযোগগুলোও তুলনামূলকভাবে বেশি কাজে লাগাতে পারে।
ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. এ. পি. জে. আব্দুল কালামের জীবন আমাদের এই শিক্ষা খুব সুন্দরভাবে দেয়।
কালামের সক্রিয় জীবনের একটি ঘটনা
ড. কালাম যখন থুম্বা ও তিরুবনন্তপুরমে মহাকাশ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তখন তাঁর দিনের শুরু হতো সকালের হাঁটা দিয়ে। একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, তিনি প্রায় ২ কিলোমিটার হাঁটতেন এবং সেই হাঁটার সময় দিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর পরিকল্পনা করতেন। তিনি ঠিক করতেন, সেদিন কোন দুই-তিনটি কাজ অবশ্যই সম্পন্ন করবেন এবং কোন কাজ তাঁর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যে সাহায্য করবে।
অর্থাৎ তাঁর কাছে হাঁটা শুধু শরীরচর্চা ছিল না। হাঁটার সময়টাকেও তিনি চিন্তা, পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নির্ধারণের কাজে ব্যবহার করতেন।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও তাঁর সক্রিয় থাকার অভ্যাস বজায় ছিল। তাঁর দৈনন্দিন রুটিনে সকালে দীর্ঘ হাঁটা, অফিসে দীর্ঘ সময় কাজ এবং সন্ধ্যার পরও কাজ করার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানেই আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।
সক্রিয় থাকা মানে শুধু ব্যায়াম করা নয়। সক্রিয় থাকা মানে শরীর, মন ও চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে রাখা।
সক্রিয় থাকার অর্থ কী?
সর্বদাই সক্রিয় থাকা মানে সারাদিন ব্যস্ত থাকা নয়। অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা এবং অর্থপূর্ণ সক্রিয়তার মধ্যে পার্থক্য আছে।
সক্রিয় মানুষ:
- নিয়মিত কিছু শেখে।
- নিজের কাজের পরিকল্পনা করে।
- শরীরকে নড়াচড়ার মধ্যে রাখে।
- নতুন ধারণা নিয়ে চিন্তা করে।
- সমস্যার সমাধান খোঁজে।
- সময়ের মূল্য বোঝে।
- সুযোগ এলে কাজে লাগায়।
- ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করে।
অন্যদিকে দীর্ঘ সময় অলসভাবে কাটালে ধীরে ধীরে কাজের আগ্রহ ও উদ্যোগ কমে যেতে পারে।
সক্রিয় থাকার উপকারিতা
১. সময়ের সঠিক ব্যবহার হয়
দিনের অনেকটা সময় আমরা অপ্রয়োজনীয়ভাবে মোবাইল দেখা, উদ্দেশ্যহীনভাবে ভিডিও দেখা বা অন্যের জীবন নিয়ে চিন্তা করে নষ্ট করি।
সক্রিয় থাকার অভ্যাস আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়:
“এই সময়টাকে আমি কীভাবে আরও ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারি?”
কালামের মতো দিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ আগে ঠিক করে নিলে সময়ের অপচয় কমানো সম্ভব।
২. মন সতেজ থাকে
শরীরচর্চা, হাঁটা, পড়াশোনা, লেখালেখি কিংবা নতুন কিছু শেখার মতো কার্যক্রম মনকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে।
বিশেষ করে কিছু সময় হাঁটতে হাঁটতে নিজের চিন্তাগুলো সাজিয়ে নেওয়া যেতে পারে। কালামের সকালের হাঁটার সঙ্গে দিনের পরিকল্পনার সম্পর্কটি এর একটি সুন্দর উদাহরণ।
৩. আত্মবিশ্বাস বাড়ে
যখন আপনি প্রতিদিন নিজের কিছু কাজ সম্পন্ন করেন, তখন নিজের ওপর বিশ্বাস বাড়তে থাকে।
আজ একটি বইয়ের কয়েক পৃষ্ঠা পড়লেন।
আজ ৩০ মিনিট হাঁটলেন।
আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করলেন।
আজ নতুন কিছু শিখলেন।
এই ছোট ছোট অর্জনগুলোই ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে।
৪. লক্ষ্যপূরণ সহজ হয়
বড় লক্ষ্য একদিনে অর্জন করা যায় না। প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজের মাধ্যমেই বড় লক্ষ্য পূরণ হয়।
কালাম তাঁর হাঁটার সময় দিনের এমন কিছু কাজ নির্ধারণ করতেন, যার অন্তত একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যে অবদান রাখবে।
এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত কার্যকর একটি অভ্যাস হতে পারে।
প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করুন:
“আজ এমন কোন কাজটি করব, যা আমাকে আমার ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের একটু কাছে নিয়ে যাবে?”
৫. অলসতা কমে
অলসতা অনেক সময় অভ্যাসে পরিণত হয়। কিন্তু আপনি যদি প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট রুটিন অনুসরণ করেন, তাহলে ধীরে ধীরে কাজ করার মানসিকতা তৈরি হয়।
সকালে হাঁটা, নিয়মিত পড়াশোনা, লেখালেখি, বাগান করা, ব্যায়াম, নতুন কিছু শেখা বা নিজের কাজ গুছিয়ে নেওয়া, যেকোনো ইতিবাচক কাজ আপনাকে সক্রিয় রাখতে পারে।
৬. নতুন সুযোগ চিনতে সাহায্য করে
সক্রিয় মানুষ সাধারণত চারপাশের বিষয়গুলো সম্পর্কে বেশি সচেতন থাকে। সে শুধু সমস্যার দিকে তাকিয়ে থাকে না, সম্ভাবনাও খোঁজে।
জীবনে অনেক সুযোগ আসে ছোট আকারে। সক্রিয় ও সচেতন মানুষ সেই সুযোগগুলো চিনতে পারে এবং কাজে লাগানোর চেষ্টা করে।
৭. শেখার আগ্রহ বাড়ে
সক্রিয় জীবন মানে শুধু শরীরকে সক্রিয় রাখা নয়, মস্তিষ্ককেও সক্রিয় রাখা।
প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করুন। একটি বই পড়ুন, নতুন শব্দ শিখুন, কোনো বিষয় নিয়ে গবেষণা করুন, নতুন দক্ষতা অর্জন করুন অথবা নিজের ভুল বিশ্লেষণ করুন।
ড. কালামের জীবনেও বিজ্ঞান, শিক্ষা, লেখালেখি ও তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতের রাষ্ট্রপতির সরকারি জীবনীতে উল্লেখ আছে, তিনি সারা দেশে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করে তরুণদের মধ্যে স্বপ্ন ও জাতীয় উন্নয়নের চিন্তা জাগানোর কাজকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
সক্রিয় থাকার জন্য একটি সহজ দৈনিক নিয়ম
আপনি চাইলে আজ থেকেই একটি ছোট নিয়ম শুরু করতে পারেন:
৩০ মিনিট শরীরের জন্য + ৩০ মিনিট মনের জন্য + ৩০ মিনিট ভবিষ্যতের জন্য।
৩০ মিনিট শরীরের জন্য: হাঁটা বা উপযুক্ত ব্যায়াম।
৩০ মিনিট মনের জন্য: বই পড়া, লেখা বা নতুন কিছু শেখা।
৩০ মিনিট ভবিষ্যতের জন্য: নিজের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য সম্পর্কিত কোনো কাজ।
প্রতিদিন এই ৯০ মিনিট অর্থপূর্ণভাবে ব্যবহার করতে পারলে আপনার জীবনে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
সক্রিয় থাকুন, কিন্তু অযথা ব্যস্ত থাকবেন না
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। সক্রিয় থাকা আর সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকা এক জিনিস নয়।
আপনি সারাদিন ব্যস্ত থেকেও যদি গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ না করেন, তাহলে সেই ব্যস্ততার মূল্য কম।
তাই নিজেকে প্রশ্ন করুন:
“আমি কি শুধু ব্যস্ত, নাকি সত্যিই এগিয়ে যাচ্ছি?”
এই প্রশ্নের উত্তর আপনার দৈনন্দিন জীবনের অনেক কিছু বদলে দিতে পারে।
কালামের জীবন থেকে মূল শিক্ষা
ড. এ. পি. জে. আব্দুল কালামের জীবনের সক্রিয়তা আমাদের শেখায় যে সময়কে শুধু পার করে দেওয়া নয়, সময়কে কাজে লাগানোই আসল বিষয়।
তিনি হাঁটতেন, চিন্তা করতেন, পরিকল্পনা করতেন, কাজ করতেন, শিখতেন এবং অন্যদের শেখাতেন। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বড় স্বপ্নের সঙ্গে প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজের যোগসূত্র তৈরি করতে হয়।
শেষ কথা
জীবনকে পরিবর্তন করার জন্য সবসময় বড় কোনো সুযোগের অপেক্ষা করবেন না। আজকের দিনটাকেই কাজে লাগান।
অল্প হাঁটুন।
কিছু পড়ুন।
নতুন কিছু শিখুন।
নিজের কাজ পরিকল্পনা করুন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করুন।
নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবুন।
শরীরকে সক্রিয় রাখুন, মনকে সক্রিয় রাখুন এবং চিন্তাকে সক্রিয় রাখুন।
মনে রাখবেন:
“নিষ্ক্রিয়তা সময়কে কেবল পার করে দেয়, কিন্তু সক্রিয়তা সময়কে অর্থপূর্ণ করে তোলে।”
আজ থেকেই সিদ্ধান্ত নিন, আপনি শুধু সময় কাটাবেন না, সময়কে কাজে লাগাবেন।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন